সোম মুখোপাধ্যায়ঃ একটা সময় বিজয়ার শুভেচ্ছা জানানোর অন্যতম সেরা মাধ্যম ছিল ডাকঘর। পুজোর অনেক আগেই কিনে রাখা বিজয়ার শুভেচ্ছা কার্ডে সুন্দর হাতে লেখা বার্তা লিখে দূর-দূরান্তের আত্মীয়দের পাঠানো হতো। আর বিজয়ার দিনে চলত ল্যান্ডলাইন ফোনের মাধ্যেমে বন্ধুবান্ধদের সঙ্গে যোগাযোগ। লাইন পেতে পেতে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা আর সংযোগ মিললেই ওপার থেকে ভেসে আসা প্রিয়জনের কণ্ঠ,সে এক অন্যরকম অনুভূতি। বাঙালির বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা বিনিময়ে একসময়ে পোস্ট কার্ডের একটি গভীর ঐতিহ্য ছিল। প্রযুক্তির যুগে এসে সেই মাধ্যমটি আজ প্রায় বিলুপ্ত। একসময় যাদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করা সম্ভব হতো না সেই আত্মীয়,বন্ধু বান্ধবদের কাছে শুভ বিজয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়ে পোস্ট কার্ড বা গ্রিটিং কার্ড পাঠানো হতো। পোস্ট কার্ডের ছোট জায়গায় খুব সংক্ষিপ্ত ও মিষ্টি ভাষায় লেখা থাকত— “সাদর সম্ভাষণ ও প্রণাম নিও,বিজয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা রইল…” বা ছোটদের জন্য আশীর্বাদ। সঙ্গে থাকত কোলাকুলি ও মিষ্টিমুখের স্মৃতির টান। সেই সঙ্গে ছিল একে অপরের বাড়ি যাওয়া। প্লেট ভর্তি নারকেল নাড়ু,নিমকি,ঘুগনি আর রসগোল্লার স্বাদেই যেন লুকিয়ে থাকত বিজয়ার আসল আনন্দ। মিষ্টিমুখ না করে কারও বাড়ি থেকে বের হওয়া সম্ভব ছিল না। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে চিত্রটা অনেকটাই বদলে গেছে। প্রযুক্তি এখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, উৎসবের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। আজ আর ল্যান্ডলাইনের লাইন পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না কিংবা বিজয়ার পোস্ট কার্ড ডাকবাক্সে ফেলতে হয় না। ২০২৬ সালের আধুনিক বাঙালি এআই-এর সাহায্যে ব্যক্তিগত সুর ও শৈলীতে নিজস্ব বিজয়ার শুভেচ্ছা বার্তা তৈরি করছে। বর্তমানে মানুষের হাতে সময় কম। ব্যস্ত জীবনে দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে স্মার্টফোন হয়ে উঠেছে নিত্যসঙ্গী। হোয়াটসঅ্যাপ,ফেসবুক, এসএমএস কিংবা ভিডিও কলের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে বার্তা। উৎসবের শুভেচ্ছা থেকে শুরু করে বিয়ে বা অন্যান্য অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ—সবই এখন কয়েকটি আঙুলের স্পর্শে সম্ভব। ফলে চিঠি লেখা,পোস্টকার্ড কেনা,ঠিকানা লেখা এবং ডাকবাক্সে ফেলে আসার দীর্ঘ প্রক্রিয়া ক্রমশই পিছনে পড়ে যাচ্ছে। অথচ একটা সময় ছিল,যখন ডাক পিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার শব্দেই বাড়িতে তৈরি হতো কৌতূহল। ডাকঘর থেকে আসা একটি চিঠি কিংবা পোস্ট কার্ড ঘিরে থাকত পরিবারের সকলের আগ্রহ। দূরে থাকা প্রিয়জনের হাতের লেখা, কয়েকটি আন্তরিক শব্দ আর নিজের মনের কথা জানানোর সেই সহজ মাধ্যমের মধ্যে লুকিয়ে থাকত গভীর আবেগ। চিঠির উত্তর পাওয়ার অপেক্ষাটুকুও ছিল সম্পর্কের এক অনন্য অনুভূতি। বিশেষ করে বিজয়া দশমীর সময় আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের পোস্ট কার্ডে শুভেচ্ছা পাঠানোর রীতি ছিল বহু পরিবারের পরিচিত ছবি। ডিজিটাল দুনিয়ায় যোগাযোগ যত দ্রুত হচ্ছে,ততই যেন ম্লান হচ্ছে চিঠির সেই স্নিগ্ধ আবেগ। তাই পোস্ট কার্ড আজ শুধু বার্তা পাঠানোর মাধ্যম নয়,বরং এক হারিয়ে যেতে বসা সময়ের সাক্ষী—যার পাতায় পাতায় জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির স্মৃতি,সম্পর্ক আর নস্টালজিয়া।
পোস্ট কার্ডে আর লেখা হয় না- শুভ বিজয়া দশমী
RELATED ARTICLES



